North Bengal Travel Blog (Bengali) – Lava, Lolegaon, Rishop

অনাবিল উত্তর বঙ্গ – লাভা, লোলেগাঁও আর রিশপ।

বিয়ের পর দূর কোথাও যেতে পারিনি বলে অনেকদিনের আপশোষ ছিল। তাই প্রথম বিবাহ বার্ষিকী একটু দুরে কোথাও প্ল্যান করব ভেবেই রেখেছিলাম। বাঙালির ভ্রমনে হাতেখড়ি করতে বাংলার বাইরে কোথাও যেতে হয় না। ধন, ধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই রাজ্যেই আছে সমুদ্র, পাহাড় আর ঘন জঙ্গল। বিয়ের পর দিঘা, তাজপুর ঘুরে সমুদ্রটা মোটামুটি দেখা হযে গেছিল। তাই এবার পাহাড়ের টানে ছুটলাম।

পাহাড় বলতেই বাঙালির চোখে ভেসে ওঠে দার্জীলিং, টাইগার হিল আর কাঞ্চনজঙ্গা। সেই আকর্ষণ আমরাও ফেলতে পারিনি। তাই দার্জীলিং রইল। আর জুড়লো মিরিক, কালিম্পং আর অগতানুগতিক গন্তব্য হিসেবে লাভা। ভ্রমনের সংখ্যা আর internet ঘেটে জায়গাটা খুব পছন্দ হয়ে গেল। দার্জীলিংএ বরফ পরার ইতিহাস খুব বেশি নেই। তাই আমরা প্রথমে চললাম লাভার দিকে। লাভা পশ্চিম বঙ্গর হাতে গোনা কযেকটি স্থান এর মধ্যে পরে যেখানে শীতে বরফ পড়ে। উত্তরবঙ্গর হিমেল শীতে বরফে ঢাকা প্রান্তর দেখার লোভে, ডিসেম্বরের এক শীতের দিনে উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস এ উঠে বসলাম আমি আর আমার স্ত্রী। উদ্দেশ্য নিউ জলপাইগুরি জংশন্। সঙ্গে চললো মনের মধ্যে অনেক আশা আর ব্যাগের মধ্যে ততোধিক গরম কাপড়।

Lava

Hanging bridge – Lolegaon

শিলিগুড়িকে বলা হয উত্তরবঙ্গর প্রবেশপথ। শিলিগুড়ি থেকে লাভা দুভাবে যাওয়া যাএ। কালিম্পং হয়ে গেলে দুরত্ব 99km আর গরুবাথান হয়ে গেলে 115 km পরে। NJP অথবা শিলিগুড়ি বাস স্ট্যান্ড থেকে গাড়ি ভাড়া করে যেতে পারেন, ভাড়া পরবে 2,000 টাকা ছোট গাড়ির জন্য আর 2,500 থেকে 3,000 টাকা বড় গাড়ির জন্য। শিলিগুড়ি বাস স্ট্যান্ড থেকে বেলা 12.10 নাগাদ একটা বাস ছাড়ে লাভার জন্য। ভাড়া 85 টাকা। আমরা একটু ঘুরপথ ধরলাম। শিলিগুড়ি পানিটাংকি মোর থেকে শেয়ার গাড়ি ছাড়ে কালিম্পং যাওয়ার। ভাড়া 100 টাকা। ওরা সামনে তিনজন বসায়ে। ড্রাইভার এর পাশে বসে প্রকৃতি অনুভব করতে করতে আরামে যেতে চাইলে একাধিক সিট কিনে নেওয়া যায়ে। আমরা তাই করলাম। শিলিগুড়ি থেকে কালিম্পং দুরত্ব 70km, সময লাগে 2.5 থেকে 3 ঘন্টা। যাত্রাপথের বেশিরভাগ সমযটাই পাশে থাকে সুন্দরী তিস্তা। শেষের দিকে তিস্তা পার করে বেশ খানিকটা ঘুরপাক খাওয়া খাড়াই রাস্তা পেরিয়ে কালিম্পং পৌছোয়ে। এখান থেকেই প্রথম দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্গাকে। দূর অবদি বিস্তৃত নানা রঙের পর্বতমালার থেকে আরো দুরে আর উচুতে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে। সেই প্রথম আমাদের বরফে ঢাকা পাহাড় দেখা। অত দূর থেকে কাঞ্চনজঙ্গাকে দেখেই আমরা মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এরপর আগামী দশদিন নানা জাযেগা থেকে কাঞ্চনজঙ্গাকে দেখেছি আর প্রতিবারই মুগ্ধ হয়েছি।

Rishop
Way to Rishop

যারা লাভা চেনেন না তাদের জন্য বলে রাখি, লাভা দার্জিলিং জেলায় 7,016 ফুট (2,138 মিটার) উচ্চতায় অবস্থিত একটি ছোট গ্রাম। কালিম্পং থেকে আলাগড় হযে এখানে পৌছনো যায়। লাভা হচ্ছে Neora Valley National Park এর প্রবেশদ্বার। কালিম্পং মোটর স্ট্যান্ড থেকে গাড়ি ভাড়া 1,000 থেকে 1,200 টাকা, শেয়ার গাড়ির ভাড়া 70 টাকা। দিনে একটা বাস আছে, যেটা লোলেগাঁও ও যায়, কালিম্পং ছাড়ে সকাল 8টা লাভা পৌছয় সকাল 10টা। লাভা তে থাকার ব্যবস্থা করেছিলাম WBFDC নেচার রিসোর্টএ। অবস্য পরে বুযলাম ওখানে না থাকলে হয়েত লাভার অর্ধেক আকর্ষণ অজানা রয়ে যেত। বছর কযেক আগেও লাভা তে এই নেচার রিসোর্ট ছাড়া ভালো থাকার জায়গা বিশেষ ছিল না। ক্রমশ পর্যটকদের মানচিত্রে লাভা যত উজ্জ্বল হযে উঠেছে, ততই নতুন হোটেল গজিয়ে উঠেছে লাভায়। মোটর স্ট্যান্ড আর লাভা বাজার এ একটু ঘুরলেই ব্যাপারটা বুজতে পারবেন। এর মধ্যে কয়েটি বিলাসবহুল হলেও, WBFDC নেচার রিসোর্টএর মত পাহাড়ের গায়ে জঙ্গলের মাঝে কাঠের কটেজে থাকার অনুভূতি কেও দিতে পারবে না। রিসোর্ট এর কটেজ গুলো বিলাসবহুল না হলেও, পরিস্কার ছিমছাম। লাভার গাছপালা হিমালয় অঞ্চল এর মত ফার, পাইন ও বার্চ এর মত আলপাইন গাছে ভরা। কালিম্পং থেকে এলে ঠান্ডা টা ভালো বুজতে পারবেন। বাতাস এ ধুলোবালি নেই। এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্গাকে পরিস্কার দেখা না গেলেও, পূর্ব সিকিম এর জেলেপ লা আর রেচেলা পাস এর সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়।

লাভাতে সবচেয়ে বেশি যা উপভোগ করবেন, তা হলো প্রকৃতি। তাছাড়া এখানে আছে লাভা মনাস্ট্রি (Kagyu Thekchen Ling Monastery), changey falls আর Neora Valley National Park। প্রকৃতিকে ভালো ভাবে উপভোগ করতে লাভা থেকে ছোট বড় বেশ কয়কটি ট্রেকিং রুট শুরু হযেছে। serious ট্রেকারদের জন্য আছে জেলেপ লা পাস্ বা Neora Valley National Park অব্দি ট্রেক। তাছাড়া আছে changey falls অব্দি ট্রেক। রিশপ অব্দি ট্রেক করে যেতে পারেন, কারণ রাস্তাটা খুব সুন্দর অথচ গাড়ির জন্য বিপজ্জনক। এছাড়া পাহাড়ি গ্রাম এর রাস্তায় কালিম্পং বা গরুবাথান এর দিকে খানিকটা হেঁটে যাওয়াকেও ট্রেকিং বলতে পারেন।

লাভা থেকে কাছাকাছির মধ্যে আছে লোলেগাঁও আর রিশপ। এগুলিও গ্রাম, এবং লাভার থেকেও ছোট। লোলেগাঁও লাভা থেকে 24 km দুরে একটা ছোট লেপ্চা গ্রাম। লাভা থেকে গাড়ি ভাড়া 1,000 টাকা। তাছাড়া রোজ সকাল 10টায় লাভা মোটর স্ট্যান্ড থেকে একটা বাস ছাড়ে লোলেগাঁওর জন্য। ভাড়া 40 টাকা। এই বাসটাই আবার 1 ঘন্টা লোলেগাঁও তে দাড়িয়ে লাভা ফিরে আসে। বাস এর ড্রাইভার একজন স্থানীয় বয়স্ক ভদ্রলোক। লোলেগাঁওর বিখ্যাত canopy walk এর কাছে নামিয়ে দিয়ে, jhandi dara থেকে তুলে নেবেন। canopy walk হলো রডোডেনড্রন গাছ এর ছায়ায় একটা সুন্দর কাঠের ঝোলা ব্রিজ। রক্ষণা বেক্ষন এর অভাবে কা এখন শোচনীয় অবস্থায়। jhandi dara থেকে কাঞ্চনজঙ্গার অপূর্ব panoramic ভিউ পাওয়া যায়। এখান থেকে সুর্যদয়র দৃশ্য tiger hill কেও হার মানিয়ে দেবে। রিশপ এর দুরত্ব লাভা থেকে মোটর পথে 12 km, আর পায়ে হেঁটে 4 km। মোটর পথ প্রথম দিকে পাকা হলেও শেষের কয়েক কিলোমিটার সুধুই বোল্ডার ফেলা। তাই, যারা পাহাড়ি রাস্তায় জঙ্গল উপভোগ করে 4 km হাটতে পারবেন, তাদের গাড়ি না করাই ভালো। গাড়ি করে গেলে, লাভা থেকে জীপ্ ভাড়া পরবে 650 টাকা, আর হেঁটে গেলে হোটেল গাইড এর ব্যবস্থা করে দেবে 200-300 টাকায়। রিশপ এ কাঞ্চনজঙ্গা ছাড়া আর দেখার প্রায় কিছুই নেই। তবে আগেই বলেছি, কাঞ্চনজঙ্গা কখনো পুরনো হবে না। এখানে tiffin dara ভিউ পয়েন্ট থেকে কাঞ্চনজঙ্গাকে অনেক কাছে মনে হবে। খেয়াল রাখবেন, রিশপ এর তাপমাত্রা কিন্তু লাভার থেকেও কম।

Frozen leaves

লাভা ছেড়ে বেরোবার সময় এই অদ্ভুত সুন্দর গ্রাম ছেড়ে আবার ইটকাঠ পাথরের জঙ্গলে ফিরতে রীতিমত কষ্ট হবে। লাভার মত জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ি গ্রামে থাকার অভিজ্ঞতা পশ্চিম বঙ্গে আর কথাও আছে কিনা জানিনা। যেখান থেকে বরফে ঢাকা কাঞ্চনজঙ্গার সুর্যদয় দেখা যায়, আবার রডোডেনড্রন এর জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া যায়, আর খিদের মুখে তিব্বতী মোমোর সাধারণ স্বাদও অপূর্ব লাগে। তবে লাভা যেতে হলে বর্ষাকালটা এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। ওখানকার কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ি পরিবেশে বর্ষায় প্রচুর জোঁক জন্মায়। তাই যাওয়ার উপযুক্ত সময় হলো অক্টোবর থেকে নভেম্বর আর মার্চ থেকে জুন। পাহাড়ি ঠান্ডা আর বরফ উপভোগ করতে চাইলে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারী তেও যেতে পারেন, কিন্তু তখন তাপমাত্রা রাতে হিমাঙ্কের নীচে নেমে যায়। গাড়ি নিতে হলে মোটর স্ট্যান্ড এর সিন্ডিকেট ছাড়া না নেওয়াই ভালো। আর থাকার জন্য WBFDC নেচার রিসোর্ট পেলে সব থেকে ভালো। তাহলে প্রকৃতির কোল থেকে প্রকৃতিকে উপভোগ করার সুযোগ পাবেন। তাহলে আর অপেক্ষা কেন, বেড়িয়ে পড়ুন, ঘুরে আসুন বাঙালির খুব কাছের লাভা, লোলেগাঁও আর রিশপ।

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s